প্রাইম লাইফ ইন্স্যুরেন্সের সম্পদ ও মুনাফা নিয়ে কারসাজি!

0
54

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত জীবন বীমা খাতের কোম্পানি প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড ২০২০ সমাপ্ত অর্থবছরে আর্থিক প্রতিবেদনে ২০৩ কোটি টাকার সম্পদ ও মুনাফা বাড়িয়ে দেখিয়েছে। কোম্পানিটির নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান সাইফুল সামসুল আলম অ্যান্ড কোম্পানি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস কোম্পানিটির বিরুদ্ধে সম্পদ ও মুনাফা বৃদ্ধির এই অভিযোগ তুলেছে।

কোম্পানিটির সর্বশেষ ২০২০ অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে মন্দ বিনিয়োগের বিপরীতে সঞ্চিতি সংরক্ষণ না করেই সম্পদ ও মুনাফা অতিরঞ্জিত করেছে। কোম্পানিটির সাবেক চেয়ারম্যান এমএ খালেক ও পরিচালনা পর্ষদের মদদে এ মন্দ বিনিয়োগ করা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ২০২০ সালে আর্থিক প্রতিবেদন প্রত্যয়ন করেছেন নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান সাইফুল সামসুল আলম অ্যান্ড কোম্পানি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টসের ম্যানেজিং পার্টনার মো. সাইফুল ইসলাম। তিনি কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদনে প্রদত্ত কোয়ালিফায়েড অপিনিয়নে উল্লেখ করেছেন, প্রাইম ফাইন্যান্স ইনভেস্টমেন্ট (পিএফআই) সিকিউরিটিজ লিমিটেডে ১৬৭ কোটি ৮০ লাখ টাকার স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগ রয়েছে প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের। পাশাপাশি পিএফআই সিকিউরিটিজের কাছে কোম্পানিটির ১৫ কোটি ৩৭ লাখ টাকা পাওনা রয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরেই এ অর্থ অনাদায়ী অবস্থায় রয়েছে। আবার পিএফআই সিকিউরিটিজের আর্থিক অবস্থাও দুর্বল। এ অবস্থায় এই অর্থ আদায় করা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। এ অর্থের বিপরীতে প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোনো ধরনের সঞ্চিতি সংরক্ষণ করেনি। এর মাধ্যমে কোম্পানিটি আর্থিক প্রতিবেদনে ১৮৩ কোটি ১৭ লাখ টাকার সম্পদ ও মুনাফার অতিরঞ্জিত তথ্য দেখিয়েছে। যদিও এ পাওনা অর্থ আদায়ের জন্য গত বছর উচ্চ আদালতে পিএফআই সিকিউরিটিজের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে কোম্পানিটি, যা বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে।

একইভাবে স্টার্লিং গ্রুপের চারটি প্রতিষ্ঠানে ১৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স। এ বিনিয়োগটিও দীর্ঘদিন ধরেই অনাদায়ী রয়েছে। এ বিনিয়োগের বিপরীতে কোনো চুক্তি নেই। যে কারণে আদৌ এ অর্থ আদায় হবে কিনা, সে বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন নিরীক্ষক।

নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান বলছে, এই বিনিয়োগের বিপরীতে এখন পর্যন্ত কোনো মুনাফা করতে পারেনি কোম্পানিটি। আবার এর বিপরীতে কোনো ধরনের সঞ্চিতিও রাখা হয়নি। এতে আর্থিক প্রতিবেদনে ১৫ কোটি টাকার সম্পদ ও মুনাফা বাড়িয়ে দেখিয়েছে প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স। যদিও এ অর্থ আদায়ে উচ্চ আদালতে স্টার্লিং গ্রুপের বিরুদ্ধে গত বছর মামলা দায়ের করেছে কোম্পানিটি, যা বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে।

এদিকে, প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের প্রায় ৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ রয়েছে বাংলালায়নের জিরো কুপন বন্ডে। বাংলালায়নের আর্থিক অবস্থা ভালো না হওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে এটি অনাদায়ী রয়েছে। ফলে এ বিনিয়োগ ফেরত পাওয়ার বিষয়ে নিরীক্ষক সন্দেহ পোষণ করেছেন। তাছাড়া এ বিনিয়োগের বিপরীতে কোম্পানিটি কোনো ধরনের সঞ্চিতিও সংরক্ষণ করেনি। অবশ্য গত বছর এ অর্থ আদায়ের জন্য প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স আরবিট্রেশন ট্রাইব্যুনালের দ্বারস্থ হয়েছে।

নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানটি কোয়ালিফাইড অপিনিয়নে তুলে ধরেছে, ২০১২ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সময়ে এ বিনিয়োগগুলো করা হয়েছে। প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের তৎকালীন চেয়ারম্যান এমএ খালেক ও পর্ষদ সদস্যরা সে সময় তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে এসব অর্থ বিনিয়োগ করেছিলেন। পিএফআই সিকিউরিটিজে যখন বিনিয়োগ করা হয়, তখন সিকিউরিটিজটির পর্ষদের কয়েকজন পরিচালক জীবন বীমা কোম্পানিটিরও পর্ষদে ছিলেন। পিএফআই সিকিউরিটিজের জন্য ব্যাংক থেকে নেয়া ঋণের বিপরীতে জামানত হিসেবে প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের এফডিআর করা অর্থ দেখানো হয়।

পরবর্তী সময়ে যখন পিএফআই সিকিউরিটিজ ব্যাংকের অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হয়, তখন ব্যাংক তাদের কাছে জামানত হিসেবে থাকা প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের এফডিআর অর্থ বাজেয়াপ্ত করা হয়। এর মাধ্যমে তাদের ঋণ সমন্বয় করে নেয়া হয়। এমনকি পিএফআই সিকিউরিটিজে থাকা প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের বিও হিসাবের ১৫ কোটি টাকাও সিকিউরিটিজটির কর্মকর্তারা আত্মসাৎ করেন।

কোম্পানির কর্মকর্তারা বলছেন, স্টার্লিং গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএ খালেকের আত্মীয়। এ কারণে চুক্তি ছাড়াই স্টার্লিং গ্রুপের চারটি প্রতিষ্ঠানে প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের অর্থ বিনিয়োগ করা হয়েছে। অন্যদিকে বাংলালায়নের বন্ডে বিনিয়োগের বিপরীতে এখন পর্যন্ত কোনো অর্থই ফেরত আসেনি। এরই মধ্যে বন্ডটির মেয়াদও শেষ হয়ে গেছে।

এদিকে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ২০১৭ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত চার বছরের আর্থিক প্রতিবেদন বিশেষ নিরীক্ষার উদ্যোগ নিয়েছে।

প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স ২০০৭ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর শেষে কোম্পানিটির সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৬৭ কোটি ৫২ লাখ টাকায়। এ সময়ে কোম্পানিটির জীবন বীমা তহবিলের পরিমাণ ছিল ৮৩৬ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। অন্যদিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের সহযোগী কোম্পানি হচ্ছে পিএফআই সিকিউরিটিজ। প্রতিষ্ঠানটির ৪৬ দশমিক ১৫ শতাংশ শেয়ার রয়েছে প্রাইম ফাইন্যান্সের কাছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here