পুঁজিবাজারে ৮ হাজার সূচক সময়ের দাবি, নতুন রেকর্ড সৃষ্টির আভাস!

0
62

গত এক বছরে বিএসইসির বেশ কিছু সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের ফলে দেশের পুঁজিবাজার তার হতাশাজনক অবস্থা থেকে ইতিবাচক ধারায় ঘুরে দাঁড়ায়। আস্থা ফিরে আসে বিনিয়োগকারীদের। ডিএসই ইনডেক্স ইতিমধ্যে রেকর্ড গড়েছে। সামনে আরও সুবাতাসের আভাস মিলছে পুঁজিবাজারে। ফলে বিনিয়োগকারীদের ধারণা ডিএসইএক্স ইনডেক্স ৮ হাজার যাবে। এতে করে দেশের পুঁজিবাজার নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করতে পারে।

করোনাভাইরাসের মধ্যেও বিশ্ব পুঁজিবাজারে সূচক বৃদ্ধির তালিকায় ষষ্ঠ স্থানে জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশ। সম্প্রতি বিনিয়োগকারীদের নিজস্ব বিনিয়োগের বিপরীতে মার্জিন ঋণ গ্রহণের রেশিও বাড়ানোর সিদ্ধান্তে আরও নতুন উচ্চতায় উঠতে পারে দেশের শেয়ারবাজার এমনটাই ধারণা করছে সংশ্লিষ্টরা।

এম সিকিউরিটিজের বিনিয়োগকারী প্রভাষক কাজী হোসাইন আলী বলেন, বিএসইসির চেয়ারম্যান হিসেবে অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম দায়িত্ব নেয়ার পর বেশ কিছু ভালো উদ্যোগ গ্রহণের ফলে নতুন উচ্চতায় একের পর এক রেকর্ড সৃষ্টি হচ্ছে। আশা করা যাচ্ছে ইনডেক্স ৮ হাজার এখন সময়ের দাবি।

বাজার সংশ্লিষ্টরা জানান, ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ৭ হাজার যাওয়া নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে একটা দ্বিধা-দ্বন্দ্ব কাজ করছিল। বিএসইসির এক সিদ্ধান্তে সেটির অবসান ঘটেছে। এখন ডিএসইএক্স ইনডেক্স ৮ হাজার যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

পুঁজিবাজারে ২০১০ সালে সবচেয়ে বড় ধস হয়। এর আগে ২০০৯ সালে রমরমা ছিল পুঁজিবাজার। এরপর দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও পুঁজিবাজারের অবস্থান আর ভালো হয়নি। মাঝে কয়েকবার বাজার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও তা সফল হয়নি। আবার নিম্নমুখী হয়েছে বাজার। অবশেষে দীর্ঘ এক যুগ পর পুঁজিবাজারে সুদিন ফিরেছে। এরপর দীর্ঘদিন ধরে পুঁজিবাজার স্থিতিশীল রয়েছে। ফলে বাজার নিয়ে আবার ভাবতে শুরু করেছেন বিনিয়োগকারীরা।

সাম্প্রতিক বাজারচিত্রে দেখা যায়, একই সঙ্গে বাড়ছে প্রায় সব ধরনের শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিটদর। একই সঙ্গে বাড়ছে সূচক ও বাজার মূলধন, বর্তমানে যা রেকর্ড অবস্থানে রয়েছে। বর্তমানে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৪৯ দশমিক ৫৩ পয়েন্ট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ছয় হাজার ৭৪৮ দশমিক ৯২ পয়েন্টে। ডিএসইর এ সূচকটি চালুর পর থেকে সর্বোচ্চ অবস্থানে ওঠে।

এর আগে সূচক কখনও এ পর্যায়ে পৌঁছায়নি। রের্কড পর্যায়ে রয়েছে ডিএসইর অন্যান্য সূচক। অপর সূচকগুলোর মধ্যে শরিয়াহ্ সূচক ৯ দশমিক ৭৯ পয়েন্ট ও ডিএসই-৩০ সূচক শূন্য দশমিক শূন্য পাঁচ পয়েন্ট বেড়ে দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে এক হাজার ৪৬৮ দশমিক ৮৩ ও দুই হাজার ৪২৭ দশমিক ৬২ পয়েন্টে।

এদিকে বর্তমানে ডিএসইতে তালিকাভুক্ত কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের বাজার মূলধন সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে। বর্তমানে ডিএসইর বাজার মূলধন রয়েছে পাঁচ লাখ ৪৯০ হাজার কোটি টাকা, যা আগে কখনও হয়নি। বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, বাজারে বর্তমান যে পরিস্থিতি রয়েছে, তা বিরাজ করলে অচিরে বাজার মূলধন ছয় লাখ কোটি টাকা হয়ে যাবে।

অন্যদিকে বর্তমানে ধারাবাহিকভাবে দুই হাজার ৫০০ কোটি টাকার বেশি লেনদেন হচ্ছে। বাজারের সার্বিক পরিস্থিতি এমন থাকলে অচিরে লেনদেন তিন হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, বাজার পরিস্থিতি ঠিক থাকলে সূচক কত হলে লেনদেন কত হচ্ছে, তা ভাবার বিষয় নয়। পুঁজিবাজারের ইতিহাসে মাত্র এক দিন তিন হাজার কোটি টাকার বেশি লেনদেন হতে দেখা যায়। ২০১০ সালের ৫ ডিসেম্বর ডিএসইতে সর্বোচ্চ লেনদেন হয়। সেদিন লেনদেনের পরিমাণ ছিল তিন হাজার ২৪৯ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) সভাপতি সাইদুর রহমান বলেন, এ সময়ের জন্য এটা অবশ্যই প্রয়োজন ছিল। এবং এটা শেয়ারবাজারের জন্য ইতিবাচক। কারণ ইনডেক্স ৭ হাজার যাওয়া নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে একটা দ্বিধা-দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছিল। তারা ভেবেছিল মার্জিন হার রেশিও কমে গেলে একটা বিক্রির চাপ বাড়তে পারে। নতুন নির্দেশনার ফলে এখন বিনিয়োগকারীদের মাঝে অস্থিরতা বা অনিশ্চয়তা কাজ করবে না। এখন তারা স্বাভাবিক গতিতে বিনিয়োগের সাথে সর্ম্পকিত থাকবে।

জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, এখন পর্যন্ত পুঁজিবাজারের সার্বিক যে পরিস্থিতি রয়েছে তাকে ভালো বলতে হবে। এখনও স্বাভাবিক রয়েছে পুঁজিবাজার। তবে খেয়াল রাখতে হবে, বাজার যেন ২০১০ সালের মতো না হয়। তেমন কোনো পরিবেশ সৃষ্টি না হয়। কয়েক দিন আগে বিমা কোম্পানির শেয়ারদর একটু বেশি বেড়ে গিয়েছিল, এখন আবার দর কমছে। এটা স্বাভাবিক বাজারের লক্ষণ। তবে এর মাঝেও বিনিয়োগকারীদের সতর্ক থাকতে হবে। তাদের বিনিয়োগ করতে হবে কোম্পানির আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে।

একই বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, পুঁজিবাজারের সার্বিক পরিস্থিতি ভালো পর্যায়ে রয়েছে। লেনদেন যা হচ্ছে তাও সন্তোষজনক। আমরা চেষ্টা করছি পুঁজিবাজার পরিস্থিতি যেন আরও ভালো হয়। এজন্য আমরা ভালো কোম্পানির আইপিওর অনুমোদন দিচ্ছি। সবমিলে পুঁজিবাজারের অনুকূল পরিবেশ বিরাজ করছে।

অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম বিএসইসির চেয়ারম্যান হিসেবে যোগদানের পর থেকে ক্রমেই ভালো হচ্ছে দেশের পুঁজিবাজার। সম্প্রতি একটি অনুষ্ঠানে বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, ‘দেশ স্বাধীন হওয়ার সময় অর্থাৎ ১৯৭১ সালে দেশের পুঁজিবাজারের অবস্থা থাইল্যান্ড ও কোরিয়ার সমান ছিল। এখন তারা অনেক দূর এগিয়ে গেছে। তবে আমরা শিগগিরই তাদের ধরে ফেলব।’

পৃথিবীর জিডিপির এক-তৃতীয়াংশ উপমহাদেশ থেকে অর্জিত হয় জানিয়ে বিএসইসির চেয়ারম্যান বলেন, ‘এই মাটি সোনার মাটি। এখানে প্রাকৃতিক এবং খনিজ সম্পদে ভরপুর। এখানে সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো মানবসম্পদ।’ পুঁজিবাজারের বর্তমান উন্নতি কারও একক অবদান নয় বরং সবার সমন্বিত চেষ্টার মাধ্যমে এই সাফল্য অর্জিত হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

প্রসঙ্গত, ২০১০-১১ সালে কয়েক দিনের ব্যবধানে বাজারে বেশিরভাগ শেয়ার অতিমূল্যায়িত হয়ে পড়ে। হুজুগে মেতে মৌলভিত্তি যাচাই না করে বিনিয়োগকারীরা এসব অতিমূল্যায়িত শেয়ার কেনেন। পরবর্তী সময়ে বাজারে পতন হলে তাদের বড় ধরনের লোকসানে পড়তে হয়, যার মাশুল তারা আজও দিয়ে যাচ্ছেন। ২০১০ সালের শেষদিকে যারা বিনিয়োগ করেছিলেন, তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন।

সে সময় মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে ডিএসইর সূচক প্রায় ১২০০ পয়েন্ট বেড়ে ৮৯১৮-এ অবস্থান করে। আর ডিএসইর লেনদেন গিয়ে দাঁড়ায় ৩২৪৯ কোটি টাকায়। কোনো কোনো শেয়ার ৩০০ থেকে ৪০০ শতাংশ পর্যন্ত অতিমূল্যায়িত হয়ে পড়ে। এর পরপর বাজারে ধস নামে।

২০১০ সালের ৫ ডিসেম্বর এক দিনের ব্যবধানে সূচকের পতন হয় ৬০০ পয়েন্ট। পরবর্তী সময়ে সূচক সাড়ে তিন হাজারের ঘরে নেমে যায়। লেনদেন চলে যায় ২০০ কোটি টাকার নিচে। সে সময় যারা অতিমূল্যায়িত শেয়ার কিনেছিলেন, তারা আজও লোকসান কাটিয়ে উঠতে পারেননি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here