ফ্যামিলি টেক্সের শেয়ার নিয়ে গুজব ছড়াচ্ছে কারা!

0
71

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বস্ত্র খাতের কোম্পানি ফ্যামিলি টেক্সের শেয়ার নিয়ে গুজব ছড়িয়ে ফায়দা লুটছে কারা এ প্রশ্ন এখন লাখ লাখ বিনিয়োগকারীদের। গত তিন বছর ধরে শেয়ারহোল্ডারদের কোনো লভ্যাংশ দেয়নি ফ্যামিলি টেক্সটাইল লিমিটেড। শুধু তাই নয়, টানা চার বছর ধরে লোকসানে থাকা কোম্পানিটি লাভের কোনো সম্ভাবনা দেখছে না, তারপরও শেয়ারের দাম বাড়ছে। সর্বশেষ এক মাসে শেয়ারটির দাম বেড়েছে ৫০ শতাংশের বেশি। আর গত দুই মাসে শেয়ারটির দাম বেড়েছে দ্বিগুণ।

পুঁজিবাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, চলতি বছর কোম্পানিটির পর্ষদ পরিবর্তন করেছে বিএসইসি। আর এ ইস্যুকে কেন্দ্র করে ঊর্ধ্বমুখী পুঁজিবাজারের সুযোগে কোম্পানির নামে নানা গুজব ছড়াচ্ছে কারসাজি চক্র। তারা বলছে, কোম্পানি শিগগিরই লোকসান থেকে মুনাফায় ফিরবে, বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ দেবে। কোম্পানির শেয়ারের দাম আবার বাড়বে, ২০-৩০ টাকা পর্যন্ত যাবে।

এসব গুজবের মাধ্যমে তিন টাকা থেকে শেয়ারের দাম সাত টাকা পর্যন্ত বাড়িয়েছে। তাদের হাতে থাকা শেয়ার বিক্রিও করছে। পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রণ সংস্থার (বিএসইসি) উচিত কারসাজির পেছনে কারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।

দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্য মতে, চলতি বছরের ২৭ জুন শতভাগ রফতানিমুখী পোশাক খাতের প্রতিষ্ঠান ফ্যামিলি টেক্সটাইলের শেয়ারের দাম ছিল ৩ টাকা ৩০ পয়সা। আর সেই শেয়ার গত ২২ আগস্ট বিক্রি হয়েছে ৬ টাকা ৬০ পয়সায়। অর্থাৎ দ্বিগুণ দাম বেড়েছে। এর মধ্যে গত ২৫ জুলাই থেকে ২২ আগস্ট পর্যন্ত শেয়ারটির দাম বেড়েছে ১ টাকা ৮০ পয়সা। ২৫ জুলাই শেয়ারের দাম ছিল ৪ টাকা ৮০ পয়সা।

শেয়ারটির দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে অর্থাৎ কারসাজি হচ্ছে এমন সন্দেহে ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ প্রাথমিকভাবে কোম্পানির কাছে জানতে চেয়েছে, কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়ার পেছনে কোনো মূল্য-সংবেদনশীল তথ্য রয়েছে কি না। কোম্পানি স্টক এক্সচেঞ্জকে জুলাই মাসে জানিয়েছে, দাম বৃদ্ধির কোনো গোপন তথ্য তাদের জানা নেই। তারপরও শেয়ারটির দাম বেড়েছেই চলছে।

এ বিষয়ে পুঁজিবাজার বিশ্লেষক অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, ২০১৩ সালে পুঁজিবাজারে আসার সময় কোম্পানি অতি মুনাফা দেখিয়ে আইপিওতে এসেছে। এরপর কয়েক বছর বোনাস শেয়ার লভ্যাংশ দিয়ে উদ্যোক্তা-পরিচালকদের শেয়ার সংখ্যা বাড়িয়েছে। এরপর বেশি দামে বিক্রি করেছে।

তিনি বলেন, কোম্পানিটির মালিকপক্ষ বাটপার। আইপিওতে আসার সময় কোম্পানিতে তাদের মালিকানা ছিল ৬৫ শতাংশের বেশি। তারা হাতে থাক সব শেয়ার বিক্রি করে দিয়েছে। লাভ দেখানো কোম্পানিটি চার বছর ধরে লোকসানে রয়েছে। এখন আবার সেই কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়ছে। স্টক এক্সচেঞ্জ ও কমিশনের উচিত বিষয়টি খতিয়ে দেখা, আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

এ বিষয়ে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, লাভ দেখিয়ে পুঁজিবাজারে আসার তিন-চার বছর পর থেকেই লোকসানে চলে আসার কারণ খতিয়ে দেখছে কমিশন। সেই লক্ষ্যে আগের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, কোম্পানটি পরিচালনার জন্য বিএসইসির পক্ষ থেকে স্বতন্ত্র পরিচালক দিয়ে পর্ষদ গঠন করা হয়েছে। পর্ষদ কোম্পানির সার্বিক দিক দেখছে। লোকসানে থাকা কোম্পানিটিকে কীভাবে লাভে আনা যায় সেই বিষয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। পর্ষদ গঠন ইস্যুকে কেন্দ্র করে হয়ত শেয়ারের দাম বাড়তে পারে। এই দাম বৃদ্ধির পেছনে কোনো কারসাজি আছে কি না খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

এ বিষয়ে কোম্পানিটির নতুন চেয়ারম্যান কাজী আমিনুল ইসলাম কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে তিনি বলেন, কমিশন আমাদের দায়িত্ব দিয়েছে কোম্পানিটির কীভাবে ভালো করা যায়, সেই পথ খুঁজে বের করতে। আর সেই পথ অনুসারে কোম্পানি পরিচালনা করতে। এর বাইরে কিছু বলতে পারব না।

টানা চার বছর ধরে লোকসানে থাকা কোম্পানিটি ২০১৩ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। ১০ টাকা দামের ৩৫ কোটি ৪০ লাখ শেয়ার ছেড়ে ৩৪ কোটি টাকা উত্তোলন করে কোম্পানিটি। ৯ টাকার বেশি শেয়ারপ্রতি আয় দেখিয়ে বাজারে আসা কোম্পানিটি ২০১২ সালের ৩১ ডিসেম্বর সমাপ্ত অর্থবছরে শেয়ারহোল্ডারদের কোনো লভ্যাংশ দেয়নি।

এরপর ২০১৩ সালের জন্য ১০০ শতাংশ, ২০১৪ সালের জন্য ১০ শতাংশ বোনাস শেয়ার লভ্যাংশ দেয়। কিন্তু ২০১৫ কোনো লভ্যাংশ দেয়নি। তবে ২০১৬-২০১৮ টানা তিন বছর ৫ শতাংশ করে বোনাস শেয়ার লভ্যাংশ দিয়েছে। আর এ সময়ে কোম্পানির এমডি-চেয়ারম্যানরা তাদের হাতে থাকা শেয়ার বিক্রি করে টাকা তুলে নেয়।

কোম্পানিটির ৩৫ কোটি ৪০ লাখ শেয়ারের মধ্যে বর্তমানে উদ্যোক্তা-পরিচালকদের হাতে ৪ দশমিক ২ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। আর বাকি ৬৪ শতাংশ শেয়ার বিক্রি করে দিয়ে টাকা তুলে নিয়েছেন কোম্পানির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ মোরশেদ ও তার স্ত্রী রোকসানা মোরশেদ এবং সাবেক এমডি ও পরিচালক মিরাজ-মোস্তফা ও পরিচালক তাবাসুম করিমরা।

ফলে তাদের বাদ দিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ফ্যামিলি টেক্সটাইলের পর্ষদ পুনর্গঠন করেছে। নতুন করে কোম্পানিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কাজী আমিনুল ইসলামকে। আর পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ড. সামির কুমার শীল, ড. গাজী মোহাম্মদ হাসান জামিল, ড. মো. জামিল শরিফ, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শরিফ এহসান এবং ড. মো. ফরজ আলীকে।

আইপিওতে আসার আগের তিন বছর অর্থাৎ ৩১ ডিসেম্বর ২০০৯ সালে কোম্পানির নিট মুনাফা দেখানো হয় ৩ কোটি ৯ লাখ ৩২ হাজার ২ টাকা, ২০১০ সালে দেখানো হয় ৪ কোটি ৮৯ লাখ ৯৩ হাজার ৩৩১ টাকা এবং ২০১১ সালে দেখানো হয় ৯ কোটি ৬২ লাখ ১৭ হাজার ২১০ টাকা। বর্তমানে কোম্পানির শেয়ারপ্রতি লোকসান রয়েছে ৬২ পয়সা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here