আমান ফিডের ব্যবসায়িক স্থায়ীত্ব নিয়ে শঙ্কা ডিএসই’র

0
278

ব্যবসা পরিচালনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতার অভাব, ব্যাংক ঋণের বোঝা এবং উৎপাদন খরচ বাড়ায় পুঁজিবাজারে বিবিধ খাতে তালিকাভুক্ত কোম্পানি আমান ফিডের ব্যবসায়িক স্থায়ীত্ব নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। 

সম্প্রতি আমান ফিডের প্রধান কার্যালয় ও কারখানা প্রাঙ্গণ পরিদর্শন করে নানা অসঙ্গতি পেয়েছে ডিএসই।কোম্পানিটির এসব অসঙ্গতি ডিএসই প্রতিবেদন আকারে শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (বিএসইসি) পাঠিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

এর আগে চলতি বছরের গত ২২ এপ্রিল শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত সাতটি কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা যাচাইয়ের লক্ষ্যে সশরীরে পরিদর্শনের অনুমতি পায় ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই ও সিএসই) কর্তৃপক্ষ। ওইসব কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে আমান ফিড। উভয় স্টক এক্সচেঞ্জের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সশরীরে কোম্পানি পরিদর্শনের অনুমতি দিয়েছে বিএসইসি। এ পরিদর্শন কার্যক্রমে কোম্পানিগুলোর আর্থিক সক্ষমতার পাশপাশি কোম্পানিগুলোর উৎপাদন ও বিপণন কার্যক্রম যাচাই করা হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের গত ৩ জুন কোম্পানিটির কারখানা প্রাঙ্গণ ও ৬ জুন প্রধান কার্যালয় পরিদর্শন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।

অন্যান্য কোম্পানিগুলো হলো, ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড, নূরানি ডাইং অ্যান্ড সোয়েটার, খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ ইন্ডাস্ট্রিজ, মোজাফফর হোসেন স্পিনিং মিলস, ইন্দো-বাংলা ফার্মাসিউটিক্যালস ও কাট্টালি টেক্সটাইল।

পরিদর্শন সংক্রান্ত প্রতিবেদনে ডিএসই উল্লেখ করেছে, কোম্পানি থেকে প্রস্তুতকৃত আর্থিক প্রতিবেদনে অসত্য তথ্য প্রদান করা হয়েছে। কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা ও বোর্ডের সদস্যরা আর্থিক ও অ-আর্থিক তথ্য প্রকাশের ব্যাপারে উদাসীন। আর্থিক প্রতিবেদনে পক্ষপাতদুষ্ট ও অসত্য তথ্য রয়েছে। আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত নথিপত্রের ঘটতি রয়েছে।

সেই হিসেবে পরিদর্শন দল মনে করে, আমান ফিডের ম্যানেজমেন্ট ব্যবসা পরিচালনায় অযোগ্য। তাদের ব্যবসা পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতি লক্ষ্য করা গেছে। এক্ষেত্রে কোম্পানির ম্যানেজমেন্ট স্বচ্ছ পরিবেশ তৈরি করতে রাজি নয়। পরিদর্শনকালে কোম্পানিটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মনোভাব ছিলো ধোঁয়াটে এবং অব্যবসায়িক। তারা পরিদর্শক দলকে কোম্পানির প্রকৃত অবস্থার কোনো প্রকার তথ্য না দেওয়ার যথাসম্ভাব্য চেষ্টা করেছেন।

এছাড়া, পরিদর্শক দল জানিয়েছে, কোম্পানির অধিক পরিমাণ ব্যাংক ঋণের বোঝা রয়েছে। ইতিমধ্যে কোম্পানিটিকে ঋণ খেলাপি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে তারা কাঁচামাল আমদানি করতে পারে না। তারা স্থানীয় উৎস থেকে উচ্চ মূল্যে কাঁচামাল ক্রয় করতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে উৎপাদন খরচ তাদের প্রতিযোগীদের তুলনায় বাড়ছে।

যা  তাদের ব্যবসায়িক স্থায়ীত্বকে পতনমুখী করে তুলতে পারে। আর কোম্পানিটির প্রসপেক্টাসের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে আমান ফিডের ঋণ ছিলো ৯০ কোটি। কিন্তু ২০২১ সালে ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫০ কোটি টাকায়। শেয়ারবাজার থেকে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহের পরিমাণ ছিলো ৭২ কোটি টাকা। আইপিও তহবিল ও ঋণ নিয়ে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ কোম্পানিটি কোথায় ব্যবহার করেছে- পরিদর্শক দলের এমন প্রশ্নের উত্তরে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ কোনো সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেনি।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, কোম্পানি অর্থিক প্রতিবেদনে অতিরঞ্জিতভাবে ক্রয় বিবরণী তৈরি করেছে। কোম্পানিটির ২০২০ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত বছরের জন্য ভ্যাট রিটার্ন অনুযায়ী ক্রয় ছিলো ৪৪৩.৯৪ কোটি টাকা। কিন্তু ২০২০ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত হিসাব বছরের জন্য কোম্পানির বার্ষিক প্রতিবেদনের ১০৪ নম্বর পৃষ্ঠায় ৫২০.৬৮ কোটি টাকা (কাঁচামাল ৪৯৯.৭৪ কোটি টাকা এবং প্যাকেজিং উপকরণ ২০.৯৪ কোটি টাকা) ক্রয় ছিলো বলে উল্লেখ করেছে।

ফলে কোম্পানিটি ২০২০ সালের ৩০ জুন  সমাপ্ত হিসাব বছরের বার্ষিক প্রতিবেদনে ক্রয় বাবদ ৭৬.৭৪ কোটি টাকা অতিরঞ্জিত করে দেখিয়েছে। এদিকে, কোম্পানিটির ২০১৯ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত বছরের জন্য ভ্যাট রিটার্ন অনুযায়ী ক্রয় ছিলো ৪৭২.৫৪ কোটি টাকা। কিন্তু ২০১৯ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত হিসাব বছরের জন্য কোম্পানির বার্ষিক প্রতিবেদনের ১০৪ নম্বর পৃষ্ঠায় ৬৬৬.২০ কোটি টাকা (কাঁচামাল ৬৩৭.৯২ কোটি টাকা এবং প্যাকেজিং উপকরণ ২৮.২৭ কোটি টাকা) ক্রয় ছিলো বলে উল্লেখ করা হয়। ফলে কোম্পানিটি ২০১৯ সালের ৩০ জুন  সমাপ্ত হিসাব বছরের বার্ষিক প্রতিবেদনে ক্রয় বাবদ ১৯৩.৬৬ কোটি টাকা অতিরঞ্জিত করে দেখিয়েছে। এর ফলে ২০২০ ও ২০১৯ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত হিসাব বছরের নিট আয় ও শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) কম দেখিয়েছে কোম্পানিটি।

একইভাবে বিল্ডিং এবং সিভিল কনস্ট্রাকশনে অতিরিক্ত খরচ হিসেবে কোম্পানি থেকে প্রদত্ত ফিক্সড অ্যাসেট রেজিস্টার অনুযায়ী, সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় অবস্থিত বিল্ডিং ও সিভিল কনস্ট্রাকশনের খরচ হিসাবে ১০০.১৯ কোটি টাকা দেখানো হয়েছে। নুলিপাড়ায় কারখানা পরিদর্শনকালে পরিদর্শক দল একটি পাঁচতলা ভবন, একটি পাওয়ার সাবস্টেশন, চারটি আধা পাকা উৎপাদন ইউনিট এবং ১২টি টিনশেড গুদাম (যার অধিকাংশই আমান সিমেন্ট মিলস থেকে ভাড়ার ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছে) দেখতে পায়।

এছাড়া, প্রধান কার্যালয় পরিদর্শনকালে পরিদর্শন দল দেখতে পায়, আমান ফিড তাদের প্রধান কার্যালয় একটি ভাড়া অফিস নিয়ে পরিচালনা করছে। তবে বিল্ডিং ও সিভিল কনস্ট্রাকশনের এই খরচ যাচাই করার জন্য কোম্পানিটি পরিদর্শক দলের কাছে প্রয়োজনীয় নথি ও ব্যাংক বিবরণী দিতে পারেনি। ফলে  বিল্ডিং ও সিভিল কনস্ট্রাকশনের খরচ হিসাবে দেখানো ১০০.১৯ কোটি টাকা বস্তুগতভাবে অতিরিক্ত বলে মনে হয়। এতে কোম্পানিটি আইন লঙ্ঘন করেছে বলেও উল্লেখ করা হয়। 

আার্থিক প্রতিবেদনে অসত্য তথ্য প্রদান প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২০ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত হিসাব বছরে আর্থিক বিবরণীর নোট ৬.০৩ অনুসারে, কোম্পানিটি ছয় মাসের বেশি মেয়াদের কোনো বাণিজ্য এবং অন্যান্য প্রাপ্তির কথা উল্লেখ করেনি। কিন্তু পরিদর্শনকারী দলকে ম্যানেজমেন্টের পক্ষ থেকে প্রদান করা ট্রেড রিসিভেবল স্টেটমেন্ট অনুযায়ী, ৬ মাসেরও বেশি মেয়াদের প্রচুর ট্রেড রিসিভেবল রয়েছে। ফলে কোম্পানিটি অসত্য তথ্য প্রদান করেছে।

আর পরিদর্শন কার্যক্রমে আমান ফিডের অসহযোগিতা প্রসঙ্গে উল্লেখ করা হয়, পরিদর্শক দল বিএসইসির নির্দেশনা অনুযায়ী কোম্পানিটি পরিদর্শন করেছে। কিন্তু কোম্পানি কর্তৃপক্ষ এ কাজে সঠিকভাবে সহযোগিতা করেনি। বিশেষ করে কোম্পানিটি প্রয়োজনীয় অধিকাংশ নথিপত্র দেয়নি। যখনই কোনো নথিপত্র সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে, তখনই কোম্পানির ম্যানেজমেন্ট তা সরবরাহ করতে চাচ্ছিলো না। এছাড়া, আমান ফিড বিএসইসি’র করপোরেট গভর্নেন্স কোর্ডের একাধিক শর্ত লঙ্ঘন করেছে বলে পরিদর্শন সংক্রান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আমার ফিডের কোম্পানি সচিব শরিফুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। রাইজিংবিডিকে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে পরে কথা বলবো।’

এদিকে, ডিএসই’র প্রধান পরিচালনা কর্মকর্তা (সিওও) এম. সাইফুর রহমান মজুমদার রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘আমান ফিডসহ আরও বেশকিছু কোম্পানির প্রধান কার্যালয় ও কারখানা প্রাঙ্গণ পরিদর্শন সংক্রান্ত প্রতিবেদন আমরা বিএসইসিতে জমা দিয়েছি। বিএসইসি সার্বিক দিক বিবেচনা করে কোম্পানিগুলোর বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবো।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here