শেয়ারবাজারকে যেভাবে পঙ্গু করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক

2
1110

২০১০ সালের নভেম্বর মাসে প্রথম আলো পত্রিকায় একটি রিপোর্ট হয় শেয়ারবাজার নিয়ে। রিপোর্টে বলা হয় সাউথইস্ট ব্যাংক বনানী ব্রাঞ্চ থেকে এক ব্যবসায়ী ৫ কোটি টাকা লোন নিয়েছে তার গার্মেন্টস ব্যবসার জন্য কিন্তু সে ঐ অর্থ তার ব্যবসায় বিনিয়োগ না করে বিনিয়োগ করেছে শেয়ারবাজারে। এরপর থেকেই বাংলাদেশ ব্যাংক উঠে পড়ে লাগে শেয়ারবাজারের পেছনে।

অডিট শুরু করে কমার্শিয়াল ব্যাংকগুলোতে। এতে বের হয়ে আসতে থাকে চমক-প্রদ সব তথ্য।সিঙ্গেল পার্টি এক্সপোজার লিমিট নিয়ম অনুসারে কমার্শিয়াল ব্যাংক গুলো তার আমানতের ১০% বিনিয়োগ করতে পারতো শেয়ার মার্কেটে। যেহেতু ব্যাংকের টাকা মূলত আমানতকারীর, তাই বাংলাদেশ ব্যাংক টাকার নিরাপত্তার স্বার্থে বিনিয়োগের একটি নিদিষ্ট সীমা দিয়ে থাকে। ২০১০ সালের শেষের দিকে বাংলাদেশ ব্যাংক তদন্ত করে দেখতে পায় অধিকাংশ ব্যাংক তার বিনিয়োগসীমার ২ থেকে ৩ গুন পর্যন্ত শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করেছে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই বিনিয়োগ ব্যাংকগুলো কি ১-২ দিনে করেছিল? নাকি ১-২ বছরে করেছিল? আমার প্রশ্ন হলো ব্যাংক গুলো যখন দিনের পর দিন শেয়ারবাজারে তাদের বিনিয়োগ বাড়িয়ে যাচ্ছিলো তখন বাংলাদেশ ব্যাংক কেন নিরব ভুমিকায় ছিল?যাক পরের পর্বে আসি। বাংলাদেশ ব্যাংক যখন দেখলো কমার্শিয়াল ব্যাংক গুলো শেয়ারবাজারে তাদের বিনিয়োগসীমার অনেক বেশি বিনিয়োগ করে ফেলেছে এরপরই বাংলাদেশ ব্যাংক কমার্শিয়াল ব্যাংক গুলোর উপর চাপ প্রয়োগ করতে থাকে বিনিয়োগ কমিয়ে আনার জন্য।

শুধু তাই নয় এর জন্য ৩ মাস সময় বেধে দেয়। এখন প্রশ্ন হলো, যে বিনিয়োগ ব্যাংক গুলো ২ বছরে করেছে সেটা কি ৩ মাসে কমিয়ে আনা সম্ভব ছিল? শুরু হয়ে গেলো প্রলয়কারী তাণ্ডব। শেয়ার বিক্রি শুরু করে দিলো ব্যাংক গুলো, সাথে বড় বড় বিনিয়োগকারীরাও। একদিনে ৬০০ পয়েন্ট পড়ে গিয়েছিল আর রচনা করেছিল বাংলাদেশের শেয়ার মার্কেটের জন্য একটি কালো অধ্যায়ের।আমারা সবাই জানি, সব কিছুর একটি সহনশীল মাত্রা রয়েছে। এর থেকে বেশি বল প্রয়োগে তা ভেঙ্গে বা নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি থাকে।

২০১০ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক কমার্শিয়াল ব্যাংক গুলোর উপর প্রচণ্ড চাপ দিতে থাকে শেয়ারবাজার থেকে তাদের বিনিয়োগ তুলে আনার জন্য। প্রথমে তারা সময় দেয় ৩ মাস, তারপর সময় বাড়িয়ে করে ৬ মাস তারপর ১ বছর পরবর্তীতে ২০১৬ সাল। বাংলাদেশ ব্যাংক যদি প্রথমেই ২০১৫ সাল অর্থাৎ ৫ বছর সময় বেধে দিত তাহলে শেয়ারবাজারের এই করুন পরিনতি হতো না।

বাংলাদেশ ব্যাংক শুধু এই কাজ টুকু করেই ক্ষান্ত থাকেনি। ২০১০ সালের নভেম্বর মাসে বলা নেই কয়া নেই CRR (Cash reserve ratio) এবং SLR (Statutory liquidity ratio) প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে বাড়িয়ে দিলো। হঠাৎ করে এই CRR এবং SLR বাড়ানোর ফলে সেই সময় মানি মার্কেটে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়। কল মানির হার ২০০ পর্যন্ত উঠে গিয়েছিল। এই জমার হার বৃদ্ধি করার মূল কারন ছিল ব্যাংক গুলো যে টাকার শেয়ার বিক্রি করছে তা যেন পুনরায় আবার কিনতে না পারে।

২০১৩ সালে এসে বাংলাদেশ ব্যাংক শেয়ারবাজারে বিনিয়োগসীমার পুরো সংজ্ঞাই পরিবর্তন করে দেয়। শেয়ারবাজারকে পঙ্গু করার জন্য যা ছিল যথেষ্ট। এই সময় তারা নিয়ম করে দিলো এখন থেকে কমার্শিয়াল ব্যাংক গুলো আর আমানতের ১০% নয়, ব্যাংকের আদায়কৃত মূলধন, শেয়ার প্রিমিয়ার হিসেবে রক্ষিত স্থিতি, সংবিধিবদ্ধ সঞ্চিতি এবং রিটেইন্ড আর্নিং এর মোট পরিমানের ২৫% এর বেশি বিনিয়োগ করতে পারবে না।

বিষয়টি আমি আরও খোলাখুলি বলি। রুপক হিসেবে আমি সাউথইস্ট ব্যাংকে ধরে নিলাম। ধরেন সাউথইস্ট ব্যাংকের আমানত আছে ২০০০০ কোটি টাকা। আগের বিনিয়োগ নীতিমালা অনুসারে অর্থাৎ আমানত এর ১০% হিসাবে সাউথইস্ট ব্যাংক শেয়ারবাজারে ২০০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে পারতো। অন্যদিকে ধরেন সাউথইস্ট ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন আছে ১২০০ কোটি টাকা। নুতন নিয়মে সাউথইস্ট ব্যাংক তার পরিশোধিত মূলধনের ২৫% অর্থাৎ ৪০০ কোটি টাকা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করতে পারবে।

২০১৩ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক শেয়ারবাজারের বিনিয়োগ নীতিমালা পরিবর্তনের মাধ্যমে ব্যাংক গুলোর বিনিয়োগ কমিয়ে এনে শেয়ারবাজারকে একটি রক্তশূন্য মৃত শেয়ারবাজারে পরিনত করে। ২০১৩ সালের নুতন নীতিমালায় আরও একটি নুতন নিয়মের প্রবর্তন করে, যা ছিল মৃত এই শেয়ারবাজারে কফিনের শেষ পেরেক। নুতন নীতিমালায় এক্সপোজার লিমিট গননার ক্ষেত্রে তারা শেয়ারের বাজার মূল্যকে মূল্যায়ন করতে বলে।

আর এই কারনে আজ পর্যন্ত শেয়ারবাজার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যেতে পারেনি। একটি উদাহরণ দিলে পরিষ্কার হয়ে যাবে। ধরেন সাউথইস্ট ব্যাংকের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ সক্ষমতা আছে ৪০০ কোটি টাকার। এই টাকা দিয়ে সাউথইস্ট ব্যাংক তিতার গ্যাস কিনলো ৩৫ টাকা করে। কিছু দিন পর তিতাস গ্যাসের দাম বেড়ে ৪০ টাকা হয়ে গেল। আর এই দাম বাড়ার কারনে সাউথইস্ট ব্যাংক যে শেয়ার কিনেছিল তার বাজার মূল্য গিয়ে দাঁড়ালো ৪২০ কোটি টাকা।

যেহেতু সাউথইস্ট ব্যাংকের বিনিয়োগ সীমা ৪০০ কোটি টাকা তাই তিতাসের দাম বাড়ার কারনে তাকে অতিরিক্ত ২০ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করে দিতে হয়। আর এই কারনে বাজার যত বাড়ে ব্যাংক গুলোর সেল প্রেশার তত বেড়ে যায়। এজন্য গত ১০ বছরে শেয়ারবাজার যতবার গতি নিয়ে উপরে উঠতে চেয়েছিল ততবারই মুখ থুবড়ে পড়ে গেছে।কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে রিজার্ভ চুরির ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে বাংলাদেশেই প্রথম।

বর্তমানে বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের পরিমান ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা। যদিও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এর মতে, বাংলাদেশে প্রকৃত অর্থে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরো অনেক বেশি। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের হার সবচেয়ে বেশি। এই তথ্য গুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের দুর্বলতাকেই প্রকাশ করে।

কিন্তু শেয়ারবাজার ভালো হতে গেলেই বাংলাদেশ ব্যাংকের অতি তৎপরতা আমাদের মনে সন্দেহের জন্ম দেয়।বিনিয়োগকারীরা সব সময় একটি স্থিতিশীল শেয়ারবাজারের স্বপ্ন দেখে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য শেয়ারবাজার অস্থিতিশীল করার বীজ বপন করা আছে ব্যাংকের বিনিয়োগ নীতিমালাতেই। আর এই নীতিমালাকে পুঁজি করে একটি দুষ্ট চক্র শেয়ারবাজার থেকে সবসময় ফায়দা নিচ্ছে।

আমরা কেউ চাই না ব্যাংক নির্ভর শেয়ারবাজার গড়ে উঠুক। আবার ব্যাংক গুলোকে বাইরে রেখেও শেয়ারবাজারকে এগিয়ে নেয়া সম্ভব নয়। তাই এই চোর-পুলিশ খেলা বন্ধ করতে হবে। শেয়ারবাজারে বাংলাদেশ ব্যাংকের অযাচিত হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে। এক্সপোজার লিমিট গননার ক্ষেত্রে শেয়ারেরবাজার মূল্যকে মূল্যায়ন না করে ক্রয় মুল্যেকে বিবেচনায় আনতে হবে। আর এই জন্য সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে।

2 COMMENTS

  1. সঠিক বলেছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকেই শেয়ার বাজারের গলার কাটা হয়ে আছে, বাংলাদেশ ব্যাংক ছায়না বাজার ভালো হোক,,

  2. এই সাংবাদিক মনে হয় অর্থনীতির সম্পর্কে জ্ঞান রাখে না। রিজার্ভ চুরি সম্পর্কে ওনার আরো স্টাডি করা উচিত। এসব আবেগি কথায় অর্থনীতি চলে না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here