“সিঙ্গাপুর স্টক এক্সচেঞ্জের মতো শেয়ারবাজারকে নিয়ে যেতে চাই: শিবলী রুবাইয়াত”

0
187

বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে চলতি বছরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রোড শো-এর আয়োজন করা হচ্ছে। এতে প্রবাসীসহ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের ‘ব্র্যান্ডিং ইমেজ’ বদলে যেতে শুরু করেছে। নেতিবাচক ধারণা পাল্টে বাংলাদেশের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়েছে।

যা আমাদের দেশে বিনিয়োগের সড়ককে অনেক প্রশস্ত করছে। একটি দৈনিক পত্রিকা দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এমনটাই বলছেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যানের অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম গত ২০২০ সালের ১৭ মে বিএসইসির চেয়ারম্যানের পদে যোগ দেন। তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) ইংরেজি বিভাগের খবর পাঠক হিসেবে যেমন দারুণ জনপ্রিয় তেমনি সাহসী, পরিশ্রমী ও দূরদর্শী ব্যক্তিত্ব হিসেবেও পরিচিত। মাত্র দেড় বছরের মধ্যে মেধা ও পরিশ্রম দিয়ে দেশের শেয়ারবাজারে ইতিবাচক ধারায় পরিবর্তন এনেছেন।

শেয়ারবাজারকে নিয়ে আপনার ভবিয্যৎ পরিকল্পনা কী?

শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম: আমাদের শেয়ারবাজার কখনোই ঠিকভাবে বিকশিত হতে পারেনি। যে জায়গায় থাকার কথা ছিল, অর্থনীতির জন্য যেখানে দাঁড়াবার কথা, সেখানে এখনো যেতে পারেনি। আমরা ওইদিকে নিয়ে যাওয়ার জন্যই কাজ করছি। উন্নত দেশে দেখবেন মেজর রোল প্লে করে শেয়ারবাজার। সেসব দেশে দেখবেন শেয়ারবাজার থেকেই সব ধরনের পুঁজির সংস্থান হচ্ছে।

একই সঙ্গে শিল্পায়ন, অবকাঠামোসহ সব উন্নয়নে প্রধান ভূমিকায় থাকছে শেয়ারবাজার। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে বন্ড, মিউনিসিপ্যাল বন্ড, ইনফ্রাস্ট্রাকচার বন্ড খুব জনপ্রিয়। অবশ্য এখন গ্রিনবন্ড, ব্লু-বন্ড- এগুলোও চলে এসেছে। ব্যাংকের মূলধন শক্ত করতে রয়েছে পারপেচুয়াল ও সাব অর্ডিনেটেড বন্ড। এছাড়া ইক্যুইটির মাধ্যমে কোম্পানিগুলোর ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে সাহায্য করা হয়ে থাকে।

এগুলোর মধ্যে আমরা শুধু ইক্যুইটি বেস নিয়ে কাজ করেছিলাম। কিন্তু সেখানেও আমরা বড় ধরনের শিল্পায়নে সহায়তা করতে পারিনি। আমরা এখন ইক্যুইটির মাধ্যমে চেষ্টা করছি ভালো ভালো কোম্পানিকে সহায়তা করার। পাশাপশি ব্যাংকগুলোর মূলধন বিভিন্ন বন্ড দিয়ে শক্তিশালী করা। ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট বিভিন্ন বন্ড নিয়ে আসা। সেই সঙ্গে ব্যবসা বাণিজ্য এবং অন্যান্য ডেরিভেটিভের মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের সাহায্য করা। এজন্য আমরা কমিউনিটি এক্সচেঞ্জ ও ডেরিভেটিভ মার্কেটগুলোর হিউম্যান ক্যাপিটাল উন্নয়ন করছি।

আপনার মেয়াদে শেয়ারবাজারকে কোন অবস্থায় নিতে চান? উন্নত বিশ্বের কোন দেশের শেয়ারবাজারের সঙ্গে সমতুল্য করতে চান?

শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম: স্বপ্ন দেখলে মানুষ সবচেয়ে ভালোটাই দেখবে। তেমনি আমরা উন্নত বিশ্বের শেয়ারবাজার যেমন- লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ, নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জ, হংকং স্টক এক্সচেঞ্জ বা সিঙ্গাপুর স্টক এক্সচেঞ্জের মতো অবস্থানে আমাদের শেয়ারবাজারকে নিয়ে যেতে চাই।

কিন্তু তার আগে আমাদের বম্বে স্টক এক্সচেঞ্জ, সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জ, ব্যাংকক ও মালয়েশিয়া স্টক এক্সচেঞ্জকে অতিক্রম করতে হবে। এরপর আমরা ধারাবাহিকভাবে সেই দিকেই আগাবো।

উন্নত বিশ্বের সমতুল্য শেয়ারবাজার তৈরিতে আমাদের করণীয় কী হতে পারে?

শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম: উন্নত বিশ্বের শেয়ারবাজারের সঙ্গে সমতুল্য করতে প্রথমত বিভিন্ন রকমের নতুন নতুন প্রোডাক্ট নিয়ে আসতে হবে। এরপর ইক্যুইটি বেইজ থেকে ডেট ইনস্ট্রুমেন্ট ডেরিভেটিভ এবং কমিউনিটি এক্সচেঞ্জ সেগুলো নিয়ে আসা। সেগুলো দিয়ে বাজারকে সম্প্রসারিত করা। বাজারের অংশগ্রহণকারী সংখ্যা বাড়ানো। বাজারের বেনিফিশিয়ারিং সংখ্যা বাড়ানো।

সেই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অর্থের বড় উৎস হিসেবে শেয়ারবাজারকে তৈরি করা। একই সঙ্গে ব্যাংক খাতের ওপর থেকে চাপ কমানো। চাপ কমালে ব্যাংক খাতের দীর্ঘমেয়াদি লোনের যে লায়াবিলিটিগুলো আসছে, যেগুলো এখন পাঁচ-দশ বছর প্রভিশন করে ইস্যুইং করে তাদের সহায়তা করা হচ্ছে, এগুলো তখন লাগতো না। তখন ব্যাংক নন পারফর্মিং লোন কমে আসতো।

মুদ্রাবাজার (মানি মার্কেট) ও শেয়ারবাজার যখন উভয়ে এক সঙ্গে কাজ করতো, তখন অর্থনীতির উন্নয়নের গতিটাও বেড়ে যেত। এখন খালি ব্যাংক খাতে চাপ পড়ে যাচ্ছে। তাদের সব দায়িত্ব নিতে হচ্ছে। এটা উন্নত অর্থনীতির জন্য কখনোই ভালো চরিত্র না। এখানে যার যে দায়িত্ব তাকে সেই কাজই করতে হয়। আমরা যখন সেই কাজে যেতে পারবো, তখনি সমন্বিত প্রয়াসে একটা উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হবো।

বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে দেশের বাইরে রোড শোগুলোতে বিনিয়োগ সাড়া পাচ্ছেন বলে আপনি বলছেন। কিন্তু তা যদি অংকে নিয়ে আসেন, তবে পরিমাণ আনুমানিক কত হতে পারে?

শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম: আমরা টাকার অংকে রিটেইল ইনভেস্টমেন্ট বিদেশ থেকে আসবে, এটা কখনো এক মুহূর্তের জন্যও আশা করি না। সেই আশায় বিদেশে গিয়ে আমরা রোড শো করছি না। বিদেশে চলতি বছরে রোড শো করেছি চারটি। করার সঙ্গে সঙ্গে বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিরা (এনআরবি) বিভিন্ন জায়গায় বিও হিসাব খোলা শুরু করেছে।

যেই আমরা আইটির বেইজে নিয়ে আসা শুরু করেছি, যে অনলাইনে বিদেশে বসে বাংলাদেশে কেনাকাটা করা যাবে, তখন কিন্তু অন্যরকম পদ্ধতিতে এনআরবিরা বিনিয়োগ করা শুরু করছে, বিদেশে বসেই এখন শেয়ারবাজারে দেখতে পায় মুঠোফোনে। ওখান থেকে তারা শেয়ার বেচাকেনা করতে পারছে। এগুলোর কারণে অনেক সময় আপনারা ভাবছেন, এই ভদ্রলোকের হয়তো ঢাকা বিও একাউন্ট আছে, ঢাকা থেকেই লেনদেন করছে।

কিন্তু আসলে সে ব্যক্তি জেদ্দা থেকে শেয়ার কেনাবেচা করছে, ব্রুনাই থেকে করছে, নিউইয়র্ক থেকে করছে। একাউন্ট যেহেতু বাংলাদেশি, বাংলাদেশেই খোলা। এখন যেহেতু সিডিবিএলের মাধ্যমে অনলাইনে বিও একাউন্ট খোলা যায়; তাই কোনটা বাংলাদেশ, কোনটা বিদেশি বুঝতে পারবেন না, যদি বাংলাদেশি নাম না হয়। এই জিনিসগুলোর কারণে শনাক্ত করা যাবে না।

তবে আমরা যতদূর জানি, রোড শোকে কেন্দ্র করে বিদেশিদের মধ্যে প্রচুর উদ্দিপনা সৃষ্টি হয়েছে বাংলাদেশ সম্পর্কে। এরই মধ্যে ব্র্যান্ডিং ইমেজ ওয়াল্ড ওয়াইট চেঞ্জ হওয়া শুরু করেছে। বিদেশিদের নেগেটিভ চিন্তাগুলোও পরিবর্তন হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের প্রতি তাদের ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়েছে। যা আমাদের দেশের বিনিয়োগ রাস্তাকে অনেক প্রশস্ত করছে।

দেশে যতো বিনিয়োগ আসবে পুঁজিবাজার ততো লাভবান হবে। আমাদের দরকার শেয়ারবাজারকে উজ্জীবিত করার জন্য আরো বিনিয়োগ আনা। আরো অর্থনৈতিক জোন ও ইপিজেডগুলোকে বিনিয়োগে ভরিয়ে দেওয়া। সেই সঙ্গে এসব কোম্পানি এবং কোম্পানির বিনিয়োগকারীকে বিনিয়োগে আগ্রহী করে তোলা। সবমিলিয়ে যখন দেশের সব খাতের উন্নতি হয়, তখনি শেয়ারবাজার লাভবান হবে।

যুক্তরাজ্যে রোড শো কেমন হয়েছে?

শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম: যুক্তরাজ্যে রোড শো খুব ভালো হয়েছে। বিশেষ করে শোতে যুক্তরাজ্য সরকারি গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আমাদের যোগসূত্র হয়েছে। যা আমাদের দেশে বিনিয়োগকে তরান্বিত করবে। এছাড়া রোড শো’র মাধ্যমে দেশটির বিভিন্ন চেম্বার থেকে শুরু করে বড় বড় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে একটি সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। তাদের কাছে আমাদের শেয়ারবাজারের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

এসব তথ্য বুলেটের গতিতে অন্যদেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে রোড শো করার পর যুক্তরাজ্য ছাড়া বিভিন্ন দেশ (গ্রীস, জাপান) থেকে এখন ফোন, মেইল আসে। আমরা যদি বলি, কোথা থেকে আপনারা তথ্য পেলেন।

তখন তারা আমাদের জানায়, যুক্তরাজ্যে তাদের অফিস রয়েছে। সেখান থেকে তারা আমাদের শেয়ারবাজার সম্পর্কে জেনেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে রোড শো ভালো হয়েছে। বিশেষ করে সিলিকন ভ্যালির রোড শোতে এক ধরনের সাড়া পেয়েছি আমরা। ওই দেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি তরুণরা দেশের আইটিতে বিনিয়োগ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here